আমরা রান্নাঘরে প্রায়শই বেকিং সোডা ব্যবহার করে থাকি। বেকিং সোডা ময়দার যে কোনও রান্না থেকে শুরু করে কেক তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।
বেশিরভাগ লোকেরা যদিও ভাবেন যে বেকিং সোডা কেবল রান্নাঘরের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং এছাড়া এর কোনো ব্যবহার নেই।
তাহলে বলেরাখি বেকিং সোডা ঘামের গন্ধ দূর করা থেকে শুরু করে দাঁতকেও সাদা ঝলমলে করে তোলা ও আরো অনেক কাজে বেকিং সোডা ব্যবহার করা হয়।
এর গুনাগুন যে স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য এর ক্ষেত্রে কতখানি তা আমাদের ধারণার বাইরে।
অত্যন্ত কম দামে পাওয়া বেকিং সোডা যেভাবে অ্যান্টাসিড হিসাবে কাজ করে তার তুলনা অসামান্য।
এছাড়াও এতে আছে অ্যান্টিসেপটিক গুন। তাই বেকিং সোডা কি কি ভাবে ব্যবহার করা যায় সেই নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বেকিং সোডা আসলে কি?
বেকিং সোডাতে থাকে সোডিয়াম বাইকার্বনেট।
এটিতে নাহকোলাইট থাকে যা natural mineral।
ইজিপ্সিয়ানরা প্রাচীন কালে এটিকে সাবান হিসাবে ব্যবহার করতেন যা বর্তমানে রান্নার একটি সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে।
বেকিং সোডা বা যার ভালো নাম সোডিয়াম বাইকার্বোনেট আমাদের জীবনের অনেক মুশকিল আশান করে খুব সহজে।
স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব কাজেই এই বেকিং সোডা ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
আসুন না আজ জেনে নি বেকিং সোডার উপকারিতা ও ব্যবহার।
দাঁতকে সাদা করে তুলতেঃ
মুক্তোর মতো জকঝকে সাদা দাঁত কে না চায়। বেকিং সোডা এই মুক্তোর মতো সাদা দাঁত পেতে সাহায্য করে।
টুথপেস্টের বদলে মাঝে মাঝে বেকিং সোডা দিয়ে দাঁত মাজলে পেয়ে যেতে পারেন মুক্তোর মতো সাদা দাঁত।
এর জন্য প্রথমে বেকিং সোডার সাথে সামান্য জল মিশিয়ে একটা ঘন মিশ্রণ তৈরী করতে হবে তারপর এই মিশ্রণ দাঁত মাজার ব্রাশের সাহায্যে ওপর নীচ করে দাঁতের ওপর ঘষতে হবে।
দাঁত মাজা শেষ হওয়ার পর জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলে দাঁত পরিষ্কার ঝকঝকে দেখাবে।
এটি মাউথ ফ্রেশনার হিসাবেও কাজ করে, ফলে মুখের দুর্গন্ধও দূর হয়।
এন্টিসেপটিক হিসাবেঃ
অনেকসময় গরম কালে আমাদের ত্বক এ নানা রকমের ইনফেকশন হতে দেখা যায় বা অনেক সময় শীত কালে ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়।
স্নানের জলে এককাপ বেকিং সোডা মিশিয়ে নিলে এইসব সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
পায়ের পাতার যত্নেঃ
পায়ের পাতার যত্ন নিতেও বেকিং সোডার জুড়ি নেই।
উষ্ণ গরম জলে ৩ চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে নিন।
এবার পায়ের পাতা জলে কিছুক্ষন চুবিয়ে রাখুন।
এতে আপনার পায়ের পাতাটি নরম এবং মসৃন হয়ে উঠবে।
ত্বকের জ্বালা কমাতেঃ
পোকা মাকড়ের কামড়ের ফলে ত্বকে নানা রকম সমস্যা হয় যেমন চুলকানো বা লাল হয়ে ফুলে ওঠা।
উষ্ণ গরম জল এবং বেকিং সোডা পেস্ট বানিয়ে সেটি লাগিয়ে কিছুক্ষন রাখলে আপনি আরাম পেতে পারেন।
ত্বকের রং উজ্জ্বল করতেঃ
রূপচর্চায় বেকিং সোডার ব্যবহার বহু পুরোনো।
রূপচর্চায় বেকিং সোডার ব্যবহার করতে হলে আপনার দরকার এক টেবিলচামচ বেকিং সোডা আর তার ঠিক দ্বিগুণ পরিমাণে লেবুর রস।
লেবুর ভিটামিন সি (vitamin c ) ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াবে, ত্বক টানটান সতেজ রাখবে।
বেকিং সোডা থাকার কারণে skin এক্সফোলিয়েটও করতে সাহায্য করে।
বেকিং সোডা আর লেবুর রস মিশিয়ে পাতলা লেই তৈরি করে মুখে মেখে নিন।
তার আগে কিন্তু মুখটা ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়ে নিতে ভুলবেন না! পনেরো মিনিট পর ভেজা তুলো দিয়ে মুছে ঠান্ডা জলের ঝাপটায় মুখ ধুয়ে নিন।
এরপর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে SPF যুক্ত ময়েশ্চারাইজ়ার লাগিয়ে নিন।
তবে এই টোটকাটা রাতেই প্রয়োগ করবেন, কারণ লেবুর রস লাগানোর পর রোদে বেরোলে রং কালো হয়ে যেতে পারে।
ত্বকের মৃত কোষ দূর করতেঃ
মৃত কোষ অপসারিত করে নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে বেকিং সোডা।
এর ফল স্বরূপ ত্বকের পুরানো দ্যুতি ফিরে আসে। এর জন্য কেবল প্রয়োজন এক চা চামচ বেকিং সোডা ,১ চা চামচ লেবুর রস ,৩ থেকে ৪ ফোটা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের মিশ্রণ বানিয়ে বৃত্তাকারের ঘষে মুখে মাখুন।
৪ থেকে ৫ মিনিট পর ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
এই ভাবে সপ্তাহে ১ থেকে ২ বার মিশ্রণটি ব্যবহার করলে স্কিন টোনের অসামঞ্জস্যের সমস্যা দূর হয়ে যাবে ও পুরানো জেল্লা ফিরে আসবে।
তবে এটি সপ্তাহে ২ দিনের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়।
পড়ুনঃ রান্নাঘরের টুকিটাকি টিপস
নখের ইনফেকশন দূর করেঃ
অনেকের পায়ের নখের ভেতর অনেক সময় ময়লা জমে।
এর ফলে নখটি যেমন দেখতে খারাপ লাগে তেমনই ইনফেকশন এর ভয় থাকে।
জলে ১বা ২ চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে পেস্ট তৈরী করে সেটি নখে লাগালে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
ছোট বাচ্চাদের ইনফেকশন দূর করতেঃ
ছোট বাচ্ছাদের আমরা আজকাল প্রায় সবসময় ডাইপার থাকতে দেখি।
এর ফলে অনেক সময় ছোট বছরের নরম ত্বকে ইনফেকশন হয়ে যেতে দেখি।
বাচ্ছাদের স্নান করানোর সময় জলে ২ চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে নিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ঠোঁটের কালচে ভাব কমাতেঃ
মধু এবং বেকিং সোডা মিশিয়ে প্রতিদিন 3 মিনিট করে ঠোঁটে লাগিয়ে রেখে তারপর জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা উচিত।
এতে ঠোঁটের এর কালোভাব দূর হয়।
হাঁটু, কনুইয়ের কালচে দাগ কমাতেঃ
শরীরের এই দুই অংশের ত্বক বাকি অংশের চেয়ে পুরু হয়।
তাই এ ক্ষেত্রে আমরা বেকিং সোডার সঙ্গে মেশাব কাঁচা আলুর রস।
বেকিং সোডা আর আলুর রস, এই দুটি উপাদানের মধ্যেই ব্লিচের গুণ রয়েছে।
একটা আলু খোসা ছাড়িয়ে গ্রেটারে কুরিয়ে নিন। এবার রসটা নিংড়ে বের করে নিয়ে তাতে এক চাচামচ বেকিং সোডা মেশান।
ভালো করে মিশিয়ে তুলোয় করে হাঁটু ও কনুইয়ের কালচে অংশগুলোয় লাগিয়ে নিন।
দশ মিনিট পরে কলের জলে ধুয়ে ফেলুন। তারপর ময়েশ্চারাইজ়িং সানস্ক্রিন অবশ্যই লাগাবেন।
সপ্তাহে দু’বার ব্যবহার করলেই হাঁটু ও কনুইয়ের রং পরিষ্কার হতে শুরু করবে।
শরীরের অন্য কোনও অংশ বেশি কালো হলে সেখানেও নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন এই মিশ্রণটি।
ঘামের তীব্র গন্ধ দূর করতেঃ
আমরা যখন ঘেমে যাই তখন আমাদের শরীর থেকে একধরনের উগ্র গন্ধ বের হয়। আশেপাশে থাকা লোকজন এই বিরক্তি কর গন্ধ সহ্য করতে পারেন না।
বেকিংসোডা এই বিশ্রী ঘামের গন্ধ দূর করতে সহায়তা করে।
এর জন্যে অল্প পরিমান বেকিং সোডা জলের মধ্যে গুলি নিয়ে বগলের নিচে লাগিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ।
তারপর ভালো ভাবে ধুয়ে নিন। এর ফলে ঘামের বাজে গন্ধ দূর হয়ে যাবে।
খুসকির সমস্যা দূর করেঃ
বেকিং সোডা ব্যবহারের ফলে অতি সহজেই খুসকির (dandruff) সমস্যা দূর করা যায়।
তাই খুশকি দূর করে চুলের যত্ন নিতে বেকিং সোডা ব্যবহার করতে পারেন।
চুলকে প্রাণবন্ত আর উজ্জ্বল করে তুলতে নিয়মিত এটি ব্যবহার করতে পারেন।
বেকিং সোডা মাথার উপরের ত্বক পরিষ্কার করে দেয় এরফলে সহজেই ত্বকের মরা চামড়া গুলি উঠে যায়।
এছাড়াও কারো যদি চুল তৈলাক্ত ধরণের হয় তাহলেও বেকিং সোডার সাহায্যে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব। কারণ বেকিং সোডাতে রয়েছে তেল শোষণকারী উপাদান।
এর জন্য সপ্তাহে যে কদিন শ্যাম্পু করবেন, সেই কদিন শ্যাম্পুর সঙ্গে কিছুটা বেকিং সোডা মিশিয়ে চুলে ব্যবহার করতে পারেন।
বুক জ্বালা (এসিডিটি) নিরাময় করতেঃ
আজকের দিনের জীবন যাত্রায় একটা অতি পরিচিত শারীরিক সমস্যা হলো এসিডটি ও তার থেকে বুক জ্বালা।
খাওয়া দাওয়ার একটু অনিয়ম হোক বা বেশি তেল, মশালাযুক্ত খাবার খাওয়াই হোক, এসিডটি কিন্তু যখন তখন হতে পারে।
ফলাফল কিন্তু একই আর তা হলো বুক জ্বালা। বুক জ্বালা করা আবার অ্যাসিড রিফ্ল্যাক্স (acid reflux) নামেও পরিচিত।
ঘরোয়া পদ্ধতিতে বেকিং সোডা ব্যবহার করে এই বুক জ্বালাকে অনায়াসেই দূর করা সম্ভব।
বুক জ্বালার কষ্ট থেকে সহজে রেহাই পেতে এক গ্লাস জলে এক চা চামচ বেকিং সোডাকে ভালো করে গুলিয়ে পান করে নিন।
অল্প সময়ের মধ্যেই আরাম পাওয়া যাবে।
তবে মনে রাখা দরকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই বেকিং সোডা যুক্ত জল পান করা উচিত। অন্যথায় বেশি পরিমান নাকিং সোডা সেবনে বিপত্তি দেখা দিতে পারে।
সান বার্ন দূর করতেঃ
রোদে বেশি সময় ধরে থাকলে শরীরের উন্মুক্ত স্থানে বাদামি রংয়ের চপ দাগ দেখা যায়। যাকে আমরা সাধরণত সান বার্ন বলে জানি।
এই রোদে পোড়া ত্বকের স্বাভাবিক রং ফিরিয়ে আনতে বেকিং সোডাকে বিশেষ ভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
কারণ এটি আ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি গুণ সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য সান বার্নের ফলে ত্বকের ক্ষতকে মেরামত করে দেয়।
শুধু তাই নয় সান বার্নের ফলে ত্বকের পিএইচ লেভেল তারতম্য দেখা যায়। বেকিং সোডার ক্ষারীয় ধর্ম ক্ষতিগ্রস্থ ত্বকের পিএইচ লেভেল স্বাভাবিক করে তুলতে সহায়তা করে।
এর ফলে সান বার্ন খুব তাড়াতাড়ি নিরাময় হয়ে যায়।
এবার সান বার্ণ দূর করতে বেকিং সোডার ব্যবহার পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক-
>ব্যবহারের পদ্ধতি<
মাত্র ১ টেবিল চামচ বেকিং সোডার সাথে প্রয়োজন মতন জল মিশিয়ে একটা ঘন পেস্ট বানিয়ে নিন।
এরপর সেই পেস্ট ত্বকের ক্ষতিগ্রস্থ অংশে প্রলেপের আকারে লাগিয়ে রাখতে হবে।
এরপর ঐ প্রলেপ শুকিয়ে গেলে ইষৎ উষ্ণ জলের সাহায্যে ত্বকের ঐ অংশ ধুয়ে ফেলতে হবে।
প্রতিদিন বেশ কয়েক বার এই প্রলেপ ব্যবহার করলে অল্প দিনের মধ্যেই ত্বকের স্বাভাবিকত্ব রং ফিরে আসবে।
মুখের ব্রণ দূর করতেঃ
বিভিন্ন বিজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায় ব্রণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে বেকিং সোডার একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
কারণ বেকিং সোডাতে রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান।
তাই মনে করা হয় বেকিং সোডার প্রয়োগের ফলে ব্রণ আক্রান্ত হওয়া ত্বকের ওপরের অংশ থেকে আঁশের মতন পাতলা চামড়া উঠে আসে।
ফলে ত্বকের ফোলা এবং লালাভ ভাব দূর হয়ে যায়।
এছাড়াও বেকিং সোডা ত্বকের অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব শুষে নিয়ে ত্বক শুষ্ক করে তোলে এবং এর ফলেই ব্রণ অঞ্চল খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
ব্রণ নিরাময়ের জন্য বেকিং সোডার প্যাক প্রস্তুত করতে হবে। আর সেই প্যাক তৈরী করার জন্য যে যে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি লাগবে, সেইগুলি হল –
১ টেবিল চামচ বেকিং সোডা এবং প্রয়োজন মতন জল।
>ব্যবহারের পদ্ধতি<
নির্দিষ্ট পরিমাণ বেকিং সোডার সাথে প্রয়োজন মতন জলের সাহায্যে একটা ঘন প্যাক তৈরী করতে হবে।
তারপর পুরু করে এই প্যাক ব্রণের ওপর লাগাতে হবে।
ত্বকে লাগানো এই প্যাক সম্পূর্ণ রূপে শুকিয়ে না যাওয়া অবধি, অন্তত ২০ মিনিট এটি মুখে লাগিয়ে রাখতে হবে।
এরপর ত্বকের ঐ অংশ হালকা হাতে ঘষে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
ভালো ফল পাওয়ার জন্য নিয়মিত অন্তত ২-৩ বার এই প্যাক লাগানো জরুরী।
--------------------------------
Image Sources: Yahoo News, Google image
------------------------








0 Comments